বেরোবি ভিসি কলিমউল্লাহ’র দুর্নীতির ৭৯০ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্র প্রকাশ

0 77

||বিদ্যাপীঠ প্রতিবেদন||

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) উপাচার্য ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর বিরুদ্ধে ৭৯০ পৃষ্ঠার ১১১টি অভিযোগের শ্বেতপত্র প্রকাশ করে তাকে অপসারণ এবং অভিযোগ তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি তুলেছেন শিক্ষকদের সংগঠন অধিকার সুরক্ষা পরিষদ।

শনিবার ক্যাম্পাসের ক্যাফেটেরিয়ায় সংবাদ সম্মেলন করে এই দাবি জানান তারা। তবে এই অভিযোগকে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও অতীতে বারংবার উচ্চারিত দুরভিসন্ধিমূলক দাবি করে ইউজিসির তদন্ত টিমকে প্রভাবিত করার উদ্দেশে করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন উপাচার্য। এছাড়াও জনসংযোগ দফতর থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এই শ্বেতপত্রটিকে তথাকথিত শ্বেতপত্র দাবি করে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

নিয়োগ বিধি শর্ত ভঙ্গ করে ক্যাম্পাসে ধারাবাহিক অনুপস্থিতি, শিক্ষক কর্মকর্তা নিয়োগ ও পদোন্নতিতে দুর্নীতি, অনিয়ম স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এনে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন থেকে আন্দোলন করছে অধিকার সুরক্ষা পরিষদ নামের একটি সংগঠন। তাদের পক্ষ থেকে ইউজিসিতে করা ৪৫টি অভিযোগের তদন্তে রোববার ক্যাম্পাসে আসার কথা একটি তদন্ত টিম। ঠিক তার আগ মুহূর্তে শনিবার দুপুরে ক্যাম্পাসে ক্যাফেটেরিয়ায় সংগঠনটি ভিসির বিরুদ্ধে ৭৯০ পৃষ্ঠার ১১১টি অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলন করলেন। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন পরিষদের আহবায়ক অধ্যাপক ড. মতিউর রহমান।

উপস্থিত ছিলেন- পরিষদের সদস্য সচিব খায়রুল কবির সুমন, শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি ড. গাজী মাজহারুল আনোয়ার, ড. তুহিন ওয়াদুদ, নীলদলের সভাপতি ড. নিতাই কুমার ঘোষ, সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মণ্ডল, বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি কমলেষ চন্দ্র রায় ও সাধারণ সম্পাদক মশিয়ার রহমান, অফিসার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফিরোজুল ইসলাম, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মাসুদ খান, ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী ইউনিয়ন সভাপতি নুর আলম, সাধারণ সম্পাদক রশিদুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য দেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক মাহমুদুল হক। এ সময় ভিসি বিরোধী বিপুল সংখ্যক শিক্ষক কর্মকর্তা ও কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে ভিসির বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ১৪ জুন তারিখে যোগদানের পর থেকে অনুপস্থিতি এবং অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক, আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, জালিয়াতি, ভর্তি বাণিজ্য, হয়রানী, নির্যাতন, নিপীড়ন এবং স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ আনা হয়।

অভিযোগে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তার মদদে তিনি এসব দুর্নীতি করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালের উপ-উপাচার্য ডক্টর আবুল কাশেম মজুমদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাবের হোসেন চৌধুরী, সুচিত্রা সেন এবং উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ তানভীর আবির প্রশিক্ষণ ও মিটিংয়ের নামে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর ড. হাসিবুর রশীদও এসব অনিয়মে যুক্ত রয়েছেন। আইন অমান্য করে তিনি ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের বিভাগীয় প্রধান নিয়োগ দিয়েছেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডের উপাচার্য এবং মা দুজনে মিলে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান উপাচার্য নিজেই। উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি, অনুষদের ডিন হিসেবে তিনি নিয়োগ বোর্ডের সদস্য আর বিভাগের প্রধান হিসেবে তিনি সদস্য, অপরদিকে তার মা বিশেষজ্ঞ সদস্য। এছাড়াও আবুল কাশেম মজুমদারকে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়োগ বোর্ডের অন্তত ১০টি বোর্ডে সদস্য করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টতা দেখানো হয়নি।

অভিযোগে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর ড. শুচিতা শারমিনকে চারটি বিভাগে নিয়োগ বোর্ডের সদস্য করা হয়েছে। উপাচার্যের পিএস আমিনুর রহমানের ভায়রা ভাই মাহমুদুল হককে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এক বছর না যেতেই সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তাকে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, উপাচার্য তার ব্যক্তিগত সহকারী ভর্তি জালিয়াতির অপরাধে সিন্ডিকেটে সাজাপ্রাপ্ত আবুল কালামের স্ত্রী নুরনাহার বেগমকে সেমিনার সহকারী, মামাতো ভাই গোলাপ মিয়া, বন্ধুর ছোট ভাই হযরত আলীকে এমএলএসএস পদে এবং ফুফাতো ভাই কাওসার হোসেনকে সেমিনার সহকারী পদে অবৈধভাবে নিয়োগ দিয়েছেন।

আর্থিক দুর্নীতির বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকারি নীতি অনুসরণ না করে অনিয়ম-দুর্নীতি করা হয়েছে। পরিবহন পুলের সাথে সংযোগ সড়ক নামে ইট বিছানো রাস্তা নির্মাণ দেখিয়ে ৫০ লাখ টাকার দুর্নীতি করা হয়েছে। ইউজিসির বরাদ্দকৃত ৩৫ লাখ টাকার কাজকে ৮৫ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। যেখানে রাস্তা নির্মাণের কাজ করেছে মেসার্স ফল ভাণ্ডার নামে একটি প্রতিষ্ঠান।

এছাড়াও উপাচার্যের আদালত অবমাননা, ঢাকাস্থ লিয়াজোঁ অফিসে অনিয়ম, বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল নির্মাণে অনিয়ম, ধারাবাহিক অনুপস্থিতিসহ বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির কথা তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনের মূল কপিতে শিক্ষার্থীদের বিষয়ে কোনো কথা না থাকার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের সময় কিছুটা এলোমেলো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ সময় সাংবাদিকদের কোনো উত্তর না দিয়ে ভিসিকে অপসারণ এবং অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান সংগঠনটির নেতারা। এছাড়াও প্রথম খণ্ড প্রকাশ করা হয়েছে আরও খন্দ প্রকাশ করা হবে বলেও জানান তারা।

তবে অধিকার সুরক্ষা পরিষদের এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করছেন ভিসি ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ। তিনি যমুনা টেলিভিশনকে বলেন, অধিকার সুরক্ষার নামে যে গোষ্ঠীটির কয়েকজন একত্রিত হয়েছেন। তারা হাতে গোনা ও চেনা মুখ। তারা আমার পূর্বতন ভিসি প্রফেসর ড. নুর উন নবীর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, তারা তার আত্মীয়স্বজন, গুণগ্রাহী ও তার বেনিফিসিয়ারি। তার সময়কার অনিয়ম ও দুর্নীতির ধারকবাহক তারা। যে অভিযোগগুলো করা হয়েছে তা ভিত্তিহীন বানোয়াট এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

তিনি আরও বলেন, এটা তাদের একটি কৌশলী রাজনীতি। যেহেতু রোববার ইউজিসি থেকে একটি তদন্ত টিম ক্যাম্পাসে আসবে। সেকারণে তাদের প্রভাবিত করার চিন্তা থেকেই একদিন আগে বারংবার প্রচারিত ও উচ্চারিত এ ধরনের অসত্য বক্তব্যগুলো ফলাও করে প্রচার করার একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। পুরো বিষয়টি পরিকল্পিত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও দুরভিসন্ধিমূলক। এর কোনো ভিত্তি নেই।

এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের সহকারী পরিচালক এহতেরামুল হক স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অধিকার সুরক্ষা পরিষদের শ্বেতপত্র বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করার জন্য মিথ্যা তথ্য দিয়ে সাজিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে তথাকথিত শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ এবং শিক্ষা, গবেষণা ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে বাধাগ্রস্ত করতেই এসব করা হয়েছে।

২০১৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ভিসিসহ দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে ৪৫টি অভিযোগ এনে শিক্ষামন্ত্রীকে লিখিত অভিযোগ করেন আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন বঙ্গবন্ধু পরিষদ। সেই বিষয়ে গঠিত ইউজিসির তদন্ত কমিটি রোববার আসবেন ক্যাম্পাসে। এরই মধ্যে ভিসির বিরুদ্ধে বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দে নির্মাণাধীন হল ও ইন্সটিটিউট নির্মাণে ভিসিকে দায়ী করে দেয়া প্রতিবেদন নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। যদিও ভিসি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

জেলা-এফএস//এমএইচ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More